ঢাকার যানজটে যায় বাজেটের ২০ শতাংশ
উন্নয়নকাজের জন্য অর্ধেক সড়ক এমনিতেই বন্ধ। বাকিটুকুতে যানবাহনগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। ছবি : কালের কণ্ঠ
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি বাদ দিয়েও বছরে প্রায় এক লাখ
কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ঢাকার যানজটে। এই ক্ষতি দেশের জাতীয় বাজেটের
প্রায় ২০ শতাংশের সমান। যানজটের কারণে দিনে নষ্ট হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ লাখ
কর্মঘণ্টা। মহানগরে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ যানজটে থেকে
মানসিকভাবে ‘যুদ্ধ’ করতে হচ্ছে। এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, যানজট প্রভাব
ফেলছে কমপক্ষে ৯টি মানবিক আচরণে। বিশেষ করে নিয়োগ পরীক্ষা, হাসপাতালে রোগী
নিয়ে যাওয়া, জরুরি সভা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদানেও বাধা তৈরি
করছে যানজট। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ ঢাকায়
এসেই
কমে যাচ্ছে যানজটের কারণে। ঢাকা মহানগর থেকে খুব কাছে সাভারে ডিইপিজেড,
নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে যেতেও স্থানে স্থানে বাধা হয়ে বিরক্তি
উৎপাদন করে যানজট।
বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সড়কের অংশ কমে যাওয়ায় অবস্থা এখন আরো নাজুক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় যানজটের তীব্রতা বেড়েছে ঢাকায়। তাঁদের মতে, রাজধানীতে যানজটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে পূর্ব ও পশ্চিমে সংযোগ সড়ক কম থাকা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাতের অবৈধ দখল, ভাসমান বিক্রেতাদের সড়ক দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, গণপরিবহন হিসেবে বাস নিবন্ধনের হার ২ শতাংশ, অথচ মোটরসাইকেল নিবন্ধনের হার ঢাকায় ৪৫ শতাংশ। বড় গাড়ির বদলে ছোট গাড়ি বেশি নিবন্ধনের উল্টো নীতিতে দিনে প্রায় স্থবির হয়ে থাকে ঢাকা। কালের কণ্ঠ’র পাঁচজন প্রতিবেদক গতকাল রবিবার ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান করে তীব্রতা দেখেছেন যানজটের। ওই সময় তেজগাঁও, বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার ও ওভারপাসেও দেখা গেছে অচলাবস্থা।
স্থবির ঢাকাকে সচল করতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে পুরনো মেয়রদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সুপারিশ করেছেন গবেষকরা। বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা ও পথচারীবান্ধব ফুটপাত চালু, প্রায় ১০ লাখ রিকশাসহ ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্যে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ১০ বছরে। তার পরও ঢাকায় যানজট কমছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চমক দেখানোর জন্য ছোট গাড়িবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করায় ঢাকা আজ মুমূর্ষু। এখন বড় প্রকল্প নয়, ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।’
বিআরটিএর পরিসখ্যান থেকে জানা যায়, আট বছরে ঢাকায় গাড়ি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১১ সালে নিবন্ধিত মোটরযান ছিল সাত লাখ দুই হাজার ৯৪৭টি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ আট হাজার ৪১৭টি। এসবের মধ্যে বাস নিবন্ধনের হার ২ শতাংশ, মোটরসাইকেল নিবন্ধনের হার ৪৫ শতাংশ।
ছোট গাড়িতে যাত্রী কম পরিবহন করা হয়; কিন্তু রাস্তার জায়গা দখল করে বেশি। এ কারণে যানজট তীব্র হচ্ছে। ঢাকায় কর্মঘণ্টা নষ্ট, জ্বালানির অপচয়সহ বিভিন্ন খাতে ২০১৪ সালেই ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকা। বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, পাঁচ বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ নিঃসন্দেহে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কারণ এ সময়ের মধ্যে ছোট গাড়ি বেড়েছে, সংযোগ সড়ক বাড়েনি। বরং ছোট গাড়ি চলাচলের জন্য ফ্লাইওভার করা হয়েছে; কিন্তু কম্পানিভিত্তিক বাস চালুর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি জানান, জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ক্ষতির পরিমাণ ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বিষয়টি যোগ করা হয়নি।
প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতি চর্চাসহ বিভিন্ন কাজের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় যাত্রীদের ঢাকামুখী চলাচল বাড়ছে। দেশের শহরে বসবাসকারী ৩২ শতাংশের বেশি মানুষ ঢাকায় বাস করছে। আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা হলেও ঢাকায় আছে ৭ শতাংশ।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন ২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঢাকার সড়কে যানজটে একটি গাড়ি ঘণ্টায় চলতে পারে পাঁচ কিলোমিটার। অথচ ১৩ বছর আগে চলতে পারত ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। দিনে এ কারণে নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধু কর্মঘণ্টা নষ্টের জন্য আর্থিক ক্ষতি বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই গবেষক বলেন, তার পরও অবস্থার উন্নয়ন হয়নি। তাঁর মতে, এ ক্ষতির ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। তা করা সম্ভব হচ্ছে না সমন্বয় না থাকায়।
অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, যানজটে ৯ ধরনের মানবিক আচরণ প্রভাবিত হচ্ছে। মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। মানসিক চাপ সব ধরনের রোগের উৎস। যানজটে আটকা পড়লে যানবাহনের চালকরা উচ্চমাত্রায় সংকেত বাজান। এতে যাত্রী ও পথচারীদের দীর্ঘস্থায়ী বধিরতার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার যানজট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০১ থেকে ১৩ বছরে ঢাকার সড়কে গাড়ি বেড়েছে ১৬ গুণ।
২০১২ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছিল, ঢাকার যানজটে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) জানায়, এ ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে ঢাকার পূর্বাংশের দিকে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া গুরুত্ব দিতে হবে ল্যান্ড জোনিং, সিটি গভর্নমেন্ট সিস্টেম চালু করার বিষয়ে। ঢাকায় বছরে স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ৩৫৮ হেক্টর জলাভূমি। দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বাস করে ঢাকায়। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০ শতাংশ এবং মোট জাতীয় আয়ের ৩৩ শতাংশ আসছে এ শহর থেকেই। ৮০ শতাংশ রপ্তানিমুখী শিল্প রয়েছে ঢাকায়। গবেষক সন্তোষ কুমার রায়ের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার যানজট নিরসন। এ লক্ষ্যে ইউ লুপ চালু, কম্পানিভিত্তিক বাস চালু করার সুপারিশ করেছেন সন্তোষ কুমার রায়। তিনি বলেন, ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার রেল ও সড়ক পথ করতে হবে। এ ছাড়া বাস টার্মিনালগুলো দ্রুত সরাতে হবে।
আনন্দ কেড়ে নেয় ঢাকার পথ : গতকাল মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত ১১.৪ কিলোমিটার অতিক্রম করতে লেগেছে সোয়া তিন ঘণ্টা। অটোরিকশায় যেতে যেতে আটকে থাকতে হয়েছে আগারগাঁও, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরে।
বিকেলে প্রগতি সরণিতে যানজটে বাসে বসেই যাত্রী রায়হান আহমেদ বললেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে যাত্রা শুরু করেই উদ্বেগে আছি। আড়াই ঘণ্টায়ও কুড়িলে যেতে পারিনি।’ সকাল পৌনে ৯টায় মহাখালী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ৩.২ কিলোমিটার পথ পেরোতে লেগেছে ৫৩ মিনিট। কর্মস্থলে যেতে মহাখালীর আমতলীতে বাসভর্তি যাত্রীরা ছিল যানজটে দীর্ঘ অপেক্ষায়।
বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সড়কের অংশ কমে যাওয়ায় অবস্থা এখন আরো নাজুক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় যানজটের তীব্রতা বেড়েছে ঢাকায়। তাঁদের মতে, রাজধানীতে যানজটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে পূর্ব ও পশ্চিমে সংযোগ সড়ক কম থাকা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাতের অবৈধ দখল, ভাসমান বিক্রেতাদের সড়ক দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, গণপরিবহন হিসেবে বাস নিবন্ধনের হার ২ শতাংশ, অথচ মোটরসাইকেল নিবন্ধনের হার ঢাকায় ৪৫ শতাংশ। বড় গাড়ির বদলে ছোট গাড়ি বেশি নিবন্ধনের উল্টো নীতিতে দিনে প্রায় স্থবির হয়ে থাকে ঢাকা। কালের কণ্ঠ’র পাঁচজন প্রতিবেদক গতকাল রবিবার ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান করে তীব্রতা দেখেছেন যানজটের। ওই সময় তেজগাঁও, বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার ও ওভারপাসেও দেখা গেছে অচলাবস্থা।
স্থবির ঢাকাকে সচল করতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে পুরনো মেয়রদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সুপারিশ করেছেন গবেষকরা। বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা ও পথচারীবান্ধব ফুটপাত চালু, প্রায় ১০ লাখ রিকশাসহ ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্যে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ১০ বছরে। তার পরও ঢাকায় যানজট কমছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চমক দেখানোর জন্য ছোট গাড়িবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করায় ঢাকা আজ মুমূর্ষু। এখন বড় প্রকল্প নয়, ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।’
বিআরটিএর পরিসখ্যান থেকে জানা যায়, আট বছরে ঢাকায় গাড়ি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১১ সালে নিবন্ধিত মোটরযান ছিল সাত লাখ দুই হাজার ৯৪৭টি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ আট হাজার ৪১৭টি। এসবের মধ্যে বাস নিবন্ধনের হার ২ শতাংশ, মোটরসাইকেল নিবন্ধনের হার ৪৫ শতাংশ।
ছোট গাড়িতে যাত্রী কম পরিবহন করা হয়; কিন্তু রাস্তার জায়গা দখল করে বেশি। এ কারণে যানজট তীব্র হচ্ছে। ঢাকায় কর্মঘণ্টা নষ্ট, জ্বালানির অপচয়সহ বিভিন্ন খাতে ২০১৪ সালেই ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকা। বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, পাঁচ বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ নিঃসন্দেহে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কারণ এ সময়ের মধ্যে ছোট গাড়ি বেড়েছে, সংযোগ সড়ক বাড়েনি। বরং ছোট গাড়ি চলাচলের জন্য ফ্লাইওভার করা হয়েছে; কিন্তু কম্পানিভিত্তিক বাস চালুর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি জানান, জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ক্ষতির পরিমাণ ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বিষয়টি যোগ করা হয়নি।
প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতি চর্চাসহ বিভিন্ন কাজের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় যাত্রীদের ঢাকামুখী চলাচল বাড়ছে। দেশের শহরে বসবাসকারী ৩২ শতাংশের বেশি মানুষ ঢাকায় বাস করছে। আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা হলেও ঢাকায় আছে ৭ শতাংশ।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন ২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঢাকার সড়কে যানজটে একটি গাড়ি ঘণ্টায় চলতে পারে পাঁচ কিলোমিটার। অথচ ১৩ বছর আগে চলতে পারত ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। দিনে এ কারণে নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধু কর্মঘণ্টা নষ্টের জন্য আর্থিক ক্ষতি বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই গবেষক বলেন, তার পরও অবস্থার উন্নয়ন হয়নি। তাঁর মতে, এ ক্ষতির ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। তা করা সম্ভব হচ্ছে না সমন্বয় না থাকায়।
অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, যানজটে ৯ ধরনের মানবিক আচরণ প্রভাবিত হচ্ছে। মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। মানসিক চাপ সব ধরনের রোগের উৎস। যানজটে আটকা পড়লে যানবাহনের চালকরা উচ্চমাত্রায় সংকেত বাজান। এতে যাত্রী ও পথচারীদের দীর্ঘস্থায়ী বধিরতার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার যানজট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০১ থেকে ১৩ বছরে ঢাকার সড়কে গাড়ি বেড়েছে ১৬ গুণ।
২০১২ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছিল, ঢাকার যানজটে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) জানায়, এ ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে ঢাকার পূর্বাংশের দিকে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া গুরুত্ব দিতে হবে ল্যান্ড জোনিং, সিটি গভর্নমেন্ট সিস্টেম চালু করার বিষয়ে। ঢাকায় বছরে স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ৩৫৮ হেক্টর জলাভূমি। দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বাস করে ঢাকায়। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০ শতাংশ এবং মোট জাতীয় আয়ের ৩৩ শতাংশ আসছে এ শহর থেকেই। ৮০ শতাংশ রপ্তানিমুখী শিল্প রয়েছে ঢাকায়। গবেষক সন্তোষ কুমার রায়ের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার যানজট নিরসন। এ লক্ষ্যে ইউ লুপ চালু, কম্পানিভিত্তিক বাস চালু করার সুপারিশ করেছেন সন্তোষ কুমার রায়। তিনি বলেন, ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার রেল ও সড়ক পথ করতে হবে। এ ছাড়া বাস টার্মিনালগুলো দ্রুত সরাতে হবে।
আনন্দ কেড়ে নেয় ঢাকার পথ : গতকাল মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত ১১.৪ কিলোমিটার অতিক্রম করতে লেগেছে সোয়া তিন ঘণ্টা। অটোরিকশায় যেতে যেতে আটকে থাকতে হয়েছে আগারগাঁও, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরে।
বিকেলে প্রগতি সরণিতে যানজটে বাসে বসেই যাত্রী রায়হান আহমেদ বললেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে যাত্রা শুরু করেই উদ্বেগে আছি। আড়াই ঘণ্টায়ও কুড়িলে যেতে পারিনি।’ সকাল পৌনে ৯টায় মহাখালী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ৩.২ কিলোমিটার পথ পেরোতে লেগেছে ৫৩ মিনিট। কর্মস্থলে যেতে মহাখালীর আমতলীতে বাসভর্তি যাত্রীরা ছিল যানজটে দীর্ঘ অপেক্ষায়।

Comments
Post a Comment